শুক্রবার, আগস্ট ১২, ২০২২
Homeঢাকা বি.মানিকগঞ্জসিংগাইরে কিছুতেই থামছেনা তিন ফসলি জমির মাটি কাটা

সিংগাইরে কিছুতেই থামছেনা তিন ফসলি জমির মাটি কাটা

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার চান্দহর, বলধারা, জামির্ত্তা ও বায়রা ইউনিয়নের সানাইল চকসহ বিভিন্ন জায়গায় এক সময় হাজার বিঘা জমিতে ধানের আবাদ হতো। কিন্তু ফসলি জমির বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠেছে ইটভাটা। এসব ভাটায় ইট তৈরীতে ফসলি জমি থেকে অবাধে মাটি কেটে সাবাড় করা হচ্ছে।

এতে ফসলি জমি পরিণত হচ্ছে ডোবা, নালা, খাল, পুকুর ও জলাশয়ে। যার বিরুপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশ, কৃষি ও প্রাণীকুলে। জনস্বাস্থ্য পড়েছে হুমকির মুখে। এ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে মাটি কাটা বন্ধে এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট দফতরে বিভিন্ন সময় অভিযোগ দিলেও কোনোভাবেই থামছে ফসলি জমির মাটিকাটা। প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে।

সিংগাইর উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা গেছে, ১০ বছর আগে উপজেলায় আবাদযোগ্য জমির পরিমান ছিল ১৬ হাজার ৩৫৮ হেক্টর। বর্তমানে এর পরিমান দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ২৪৫ হেক্টরে। ইটভাটা, কারখানা ও বসতবাড়ি নির্মানের কারনে ৮শ ৫০ বিঘা জমি কমে গেছে। তবে এর চেয়ে আরো বেশী জমি আবাদহীন হয়ে পড়েছে বলে দাবী এলাকাবাসীর। ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী উপজেলায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ৬০টি ইটভাটার মধ্যে বলধারা ইউনিয়নেই রয়েছে ২৯ টি ইটভাটা।

এ ছাড়া চান্দহরে ১০ টি, বায়রাতে ৭টি, জামির্ত্তায় ৬টি, চারিগ্রামে ৩টি, সিংগাইর সদরে ৩টি ও ধল্লায় ২ টি ইটভাটা চালু রয়েছে। ইটভাটা মালিকদের দেয়া তথ্য ও স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব ইটভাটার প্রায় প্রত্যেকটিতে ৮ থেকে ১০ একর আবাদী জমি আটকে আছে। এ ভাটাগুলোয় মাটি সরবরাহের জন্য গত ১০ বছরে অন্তত কয়েকশ বিঘা আবাদযোগ্য জমির মাটি কাটা হয়েছে।

উপজেলার চান্দহর ইউনিয়নের রিফায়েতপুর খেজুর বাগান, বিলবাড়ির চক, বলধারা, খোলাপাড়া , হুনাখালি চক ও বায়রার সানাইল চকে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় দু’ডজন ইটভাটা রয়েছে। এসব ভাটার চারপাশসহ পুরো এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় জলাশয়ের। যা ১০ বছর আগে ছিলনা।

সরেজমিন শনিবার (১২ মার্চ) দেখা যায়, গোবিন্দল-জৈল্যা নতুন চর , হুনাখালী চক ও সানাইল চকের একাধিকস্থানে কৃষি জমি থেকে ভেকু দিয়ে দিন-রাত সমান তালে মাটি কাটার দৃশ্য। খোলাপাড়া গ্রামের এএবি ব্রিকসের মালিক আব্দুল কুদ্দুস, এবিসি ব্রিকসের নূরুল হক কোম্পানী, এমআরএম ব্রিকসের মোয়াজ্জেম হেসেন, মাটি ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক, আলীমুদ্দিন, আনোয়ার, ফয়সালসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ওইসব জমি থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় নিচ্ছেন বলে জানা যায়।

ফসলি জমি রক্ষায় ২০১৩ সালের পরিবেশ আইন ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রন আইন যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন জমির মালিকরাসহ সচেতন সিংগাইরবাসী।

চান্দহর ইউনিয়নের ওয়াইজনগর গ্রামের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আমাদের রিফায়েতপুর-মাধবপুর চকটি ইটভাটার নগরীতে পরিনত হয়েছে। মাটি খেকোরা দিনের পরিবর্তে এখন রাতের আঁধারে মাটি চুরি করছে। গভীর করে ফসলি জমি থেকে মাটি কাটায় পার্শ্ববর্তী জমিও ভেঙ্গে চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

মানিকনগর গ্রামের ভুক্তভোগী জমির মালিক চান্দহর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মো. আনিসুর রহমান বলেন, আমরা গত পনের দিন আগে উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) বরাবর কৃষি জমি থেকে মাটি কাটা বন্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেও কোনো ফল পাচ্ছি না। আমাদের ইউপি চেয়ারম্যান শওকত হোসেন বাদলের ইন্ধনেই এ মাটি কাটা অব্যাহত রয়েছে।

চান্দহর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শওকত হোসেন বাদল বলেন, আমি সব সময়ই মাটি কাটা বন্ধের পক্ষে। আমার ইজ্জত নষ্ট করার জন্য একটা পক্ষ আমাকে জড়িয়ে বিভিন্ন কথা বলে বেড়াচ্ছে।

সিংগাইর উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারন সম্পাদক ও মাটি ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস কোম্পানীর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে ইটভাটা মালিক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য ও মানিকগঞ্জ জেলা পরিষদ সদস্য চারিগ্রাম এলাকায় অবস্থিত এএইচএম ব্রিকসের মালিক মো. আব্দুল আলীম এক ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা মাটি কাটলে আইল থেকে ১০ ফুট রেখে কাটি।

চান্দহর ইউনিয়ন ভূমি সহকারি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুস ছালাম বলেন, ফসলি জমি থেকে রাতের আঁধারে মাটি কাটার বিষয়টি আমি উর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ টিপু সুলতান সপন বলেন, আমরা সবসময়ই কৃষকদের উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জমির শ্রেনী পরিবর্তন না করার জন্য উদ্বুদ্ধ করি। তারপরও যদি কাটে আমাদের কি বা করার আছে। ইটভাটাসহ বিভিন্ন কারনেই প্রতি বছর ০.৭০ শতাংশ হারে ফসলি জমি হ্রাস পাচ্ছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) শাম্মা লাব্বিবা অর্ণবকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার দিপন দেবনাথ বলেন, আমরা ফসলি জমি থেকে মাটিকাটা বন্ধে সচেষ্ট আছি। ইতিমধ্যেই রাত সাড়ে ১১ টার দিকে বলধারা এলাকায় গিয়েও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছি। আপনারাও একটু উদ্যোগী হোন। গণসচেতনতা বৃদ্ধি করে কৃষি জমি রক্ষায় সবাই মিলে কাজ করলে একটা ভাল কিছু আশা করা যায়। তারপরও আমি এখনি এসি ল্যান্ডকে বলছি ব্যবস্থা নিতে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular