মাহে রমজানের দ্বিতীয় দশক মাগফিরাত লাভের শ্রেষ্ঠ সময়

রমজান

রমজানের চাঁদ ওঠার সাথে সাথেই মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মুসলিম উম্মাহর প্রতি বিশেষ দয়া দৃষ্টি দেন। সব শয়তানকে শৃঙ্খলবদ্ধ করে ফেলানো হয়। অবাধ্য জিনদেরও বন্দি করে রাখেন আল্লাহ তায়ালা। এ জন্যই অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় মাহে রমজানে পাপের বিস্তার থাকে কম।

রাসূল সা.বলেন, যখন পবিত্র রমজান মাস শুরু হয় তখন আকাশের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদেরকে শৃঙ্খলবদ্ধ করা হয় [বুখারী শরীফ ১৮৯৯]। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রহমতের সব দরজা খুলে দেওয়া হয় [মুসলিম শরীফ]। আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, অবারিত করে দেওয়া হয় জান্নাতের দরজাগুলো [মুসলিম শরীফ]।

পুরো মাসজুড়েই রহমত ও মাগফিরাত থাকলেও রাসূল সা. রমজানকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। প্রিয় নবী সা. ইরশাদ করেন, হে লোক সকল, তোমাদের নিকট এক মহান ও বরকতময় মাস এসেছে। এটি এমন এক মাস যার শুরুতে রহমত, মাঝে মাগফিরাত এবং শেষে রয়েছে জাহান্নাম থেকে নাজাত ও মুক্তি [ইবনু খুযাইমা, ইবনু শাহিন ও বাইহাকি প্রণীত শুআবুল ইমান]।

আল্লাহর রহমতে সিক্ত না হলে ইসলামের পথে চলা যায় না। আল্লাহর রহমতে যখন সিয়াম সাধনা শুরু হয় তখন ধীরে ধীরে বান্দা আল্লাহর পক্ষ থেকে মাগফিরাত লাভের উপযুক্ত হয়। মাগফিরাত লাভের পর জান্নাতে যেতে থাকে না কোনো বাধা। এ জন্য রহমত ও মাগফিরাতের পর শেষ দশককে নাজাত ও মুক্তির দশক বলা হয়েছে।

মাগফিরাত অর্থ ক্ষমা। মানুষ মাত্রই পাপ করে। কেবল নবী রাসূলরা নিষ্পাপ হন। তা ছাড়া সাধারণ মানুষ প্রত্যেকেই কিছু না কিছু পাপ করে ফেলে। রাসূল সা. বলেন প্রতিটি আদম সন্তান পাপী, আর পাপীদের মধ্যে উত্তম হচ্ছে তাওবাকারী [তিরিমিযি শরীফ]। মানুষ ফেরেশতা নয়, মানুষ পাপ করবেই। কিন্তু শয়তান আর মানুষের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে এই যে, শয়তান তার পাপের উপর থাকে অটল, মানুষ তাওবা করে নিজেকে করে নেয় পবিত্র। মাহে রমজান নিজেকে শুদ্ধ করার মাস, অন্তরাত্মাকে পবিত্র করার মাহেন্দ্রক্ষণ এই পবিত্র রমজানুল মুবারক।

যত গুনাহ হোক,আল্লাহ সব মাফ করে দিবেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ শিরিকের গুনাহ ক্ষমা করবেন না, শিরিক ছাড়া অন্য সব গুনাহ যাকে ইচ্ছা তাকে মাফ করে দিবেন [সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮]।

অন্যত্র ইরশাদ করেন, হে আমার অবাধ্য বান্দারা তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, নিশ্চয়ই তিনি সব গুনাহ মাফ করে দিবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু [সুরা যুমার,আয়াত: ৫৩]।

এমন স্পষ্ট ঘোষণার পর আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ থাকে না। আল্লাহ যেহেতু ঘোষণা দিয়েছেন কাজেই তিনি আমাদের অবশ্যই মাফ করবেন। তিনি বড় দয়াবান। কিন্তু আমাদেরকে সেই মাফ চাইতে হবে। আল্লাহ কেবল চান- আমরা যেন তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা যেন খাঁটি মনে তাওবা করি। সব গুনাহর জন্য আল্লাহর দরবারে যেন আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হই। অন্যায় করতে করতে মানুষের ভেতর ভালো মন্দের পার্থক্য বোধ রহিত হয়ে যায়। অত্যাধিক অপরাধ করার ফলে হৃদয়ে মোহর পড়ে যায়। পাথরের মত শক্ত হয়ে যায় কলব। সেই পাথর ভেঙে মন নরম করার মাস পবিত্র রমজানুল মুবারক। রাসূল সা.বলেন, যখন ভালো কাজ তোমার ভালো লাগে এবং মন্দ কাজ তোমার কাছে মন্দ মনে হয় তখন বুঝে নাও তুমি মুমিন [মুসনাদু আহমাদ]।

ভালো মন্দের পার্থক্য যারা করতে পারে না তারা ইমানদার হতে পারে না। ইমানদার যখন অন্যায় করে ফেলে তখন দ্রুতই অনুতাপে দগ্ধ হয়। যার ভেতর সেই অনুতাপ বোধ নষ্ট হয়ে গেছে তাকে বুঝতে হবে, আধ্যাত্মিক এক শুন্যতা তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। আশু চিকিৎসার মাধ্যমে যার নিরাময় কাম্য।

আল্লাহ ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালো বাসেন। এ কথার ভুল অর্থ বোঝায় শয়তান। যাদের আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস আছে তাদেরকে শয়তান এভাবে ধোঁকায় ফেলে, যত ইচ্ছা পাপ করো, মানুষকে কষ্ট দাও, অন্যের অর্থ আত্মসাৎ করে খাও, সুদ খাও, ঘুষ খাও, দুর্নীতি করে যাও, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করো, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন কর; আল্লাহ বড় মেহেরবান, ক্ষমাশীল, গাফুরুর রাহীম। নাউযুবিল্লাহ, আল্লাহর ক্ষমাশীল হবার অর্থ তো এটা নয়।

অতীতকালে বনী ইসরাইলের লোকজন শয়তানের এমন অপযুক্তিতে বড় বড় অপরাধ সংগঠিত করতো। তারা সামান্য স্বার্থের জন্য আল্লাহর পয়গম্বরদেরকে হত্যা করে ফেলতো, অন্যের সম্পদ ছিনিয়ে নিতো, মিথ্যা বলতো, মারামারি ও ঝগড়া ফ্যাসাদ বাঁধাতো; আর বলতো, আমাদের গুনাহর চাইতে আল্লাহর ক্ষমা অনেক বড়। কাজেই যত ইচ্ছা গুনাহ আমরা করতে পারি। নাউযুবিল্লাহ। মহান আল্লাহর ক্ষমাশীলতার অর্থ এ নয় যে, তার নাফরমানি ও অবাধ্যতা করতে হবে বেশি বেশি। যেই মহান মালিক এত দয়াশীল ক্ষমাশীল অনুগ্রহকারী তার অবাধ্যতা করি কোনো দুর্বুদ্ধিতে?

কোনো সাধারণ মানুষও যদি আপনার উপকার করে; অর্থ দিয়ে, সুবিধা ও সেবা দিয়ে-আপনি জান প্রাণ দিয়ে তার কথা রক্ষা করার চেষ্টা করেন, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে চলেন। মহান সৃষ্টিকর্তা যিনি আমাদের জীবন দিয়েছেন, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের লালন পালন করছেন- তার আদেশ মেনে চলা কত জরুরি তা বলে বুঝানোর অপেক্ষা রাখে না।

মাগফিরাতের এই সময়ে আমাদের বুঝতে হবে, আল্লাহর হুকুম অমান্য করলে আল্লাহর কোনো ক্ষতি হয় না। ভবিষ্যতে তাওবা করলে আল্লাহ হয়তো আপনার তাওবা কবুল করবেন, আপনাকে ক্ষমা করবেন। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন, আল্লাহর হুকুম লংঘন করে আপনি মহাশান্তির স্বাদ অনুভব করবেন, তাহলে তা চরম নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছু নয়। পাপ কাজে সাময়িক আনন্দ আছে, কিন্তু সামান্য একটু আনন্দের জন্য দীর্ঘ দুঃখ ভোগের মূল্য পরিশোধ করতে হয়। প্রতিটি পাপে ভোগ করতে হয় চরম যাতনা। আল্লাহ বলেছেন, তুমি পিতা মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো; আপনি যদি মনে করেন, বাবা-মায়ের সাথে দুর্ব্যবহার করে আপনি অত্যন্ত লাভবান হবেন তবে আপনি আসলে চরম ভুলের ভেতর আছেন।

আল্লাহর কোনো হুকুম অমান্য করেই কেউ কখনও লাভবান হতে পারে না। সুখী হতে পারে না। আখেরাতের নরক তো আছেই, এই দুনিয়াতেও পাপীষ্ঠ মানুষ সব সময় সীমাহীন নরক যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে। প্রতিটি পাপে অন্তরে কালো দাগ পড়ে যায়। একসময় পুরো হৃদয় কালিতে ভরে যায়। আল্লাহর মাগফিরাত নিয়ে অন্তর ধুয়ে পরিষ্কার না করলে সেই হৃদয়ে কোনো ভালো মন্দের বোধ থাকে না। জীবনের শুদ্ধতা হারিয়ে চরম হতাশায় নিমজ্জিত হয় মানব মন।

রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহেই শুরু হচ্ছে বাংলা বর্ষের প্রথম মাস বৈশাখ। বৈশাখের খরতাপ মাটিকে যেভাবে শুদ্ধ করে-রমজানের পবিত্র সময় সেভাবেই আমাদের পাপী অন্তরগুলো পবিত্র করে যাকে। আরবি রমজান শব্দের অর্থ জ্বালিয়ে দেওয়া, পুড়িয়ে দেওয়া। গ্রীষ্মের খরতাপের মতই রমজান জীবনের সব পাপ তাপ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়, তাই রমজানকে রমজান নামকরণ করা হয়েছে আল কুরআনে।

অনেক তাফসীরকারক লিখেছেন, আরবে প্রথম যখন চাঁদের বারো মাসের নামকরণ করা হয়, তখন রমজান মাস পড়েছিল গ্রীস্মের চরম গরমে, এ জন্য এই মাসটিকে আরবরা রমজান নাম দিয়েছিল। আরবি ভাষায় রমজান অর্থ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া। সে বছর রমজানে আরবে প্রচণ্ড গরমে মানুষ দিশেহারা ছিল, এ জন্য তারা এই নাম চয়ন করেছিল।

রমজানের এই দশক আপনার আমার জীবনে আল্লাহর মাগফিরাত লাভের এক শ্রেষ্ঠ সময় হোক। আল্লাহ আমাদের সবাইকে মাগফিরাত করুন। আমিন।

লেখকঃ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও প্রকাশকঃ বাংলা পোস্ট |√| বিশেষ প্রতিবেদক দৈনিক নয়াদেশ |√| ও প্রকাশক বাংলাদেশ জ্ঞান সৃজনশীল প্রকাশনা |√|