বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে নষ্ট করেছে : হানিফ

বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে নষ্ট করেছে : হানিফ

বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে নষ্ট করেছে বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম। বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে নষ্ট করেছে। এ ব্যবস্থাকে আপনারাই বিতর্কিত করেছেন। যার কারণে উচ্চ আদালত এ বিধান বাতিল করেছে। কাজেই এটা নিয়ে আপনাদের কথা বলার কোনো অধিকার নেই।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দাবি করার প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (৮ মার্চ) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ‘চারুকলা সম্মেলন ২০২২’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে হানিফ এসব কথা বলেন।

মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে বিএনপি বিশ্বের মিথ্যাচারের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভদ্রলোক মির্জা ফখরুল নাকি শিক্ষিত, শিক্ষকতা করতেন জানতাম। শিক্ষক হয়েও মানুষ কি ধরণের নির্লজ্জ হতে পারে তাকে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। মির্জা ফখরুলের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনার নেতা তারেক রহমান হাওয়া ভবন বানিয়ে দেশে সরকারের বিকল্প সরকার করেছিল এবং সেই সরকারের কাজ ছিল দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও লুটপাট করা।

আওয়ামী লীগ যাতে এসবের প্রতিবাদ না করতে পারে সেজন্য হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের ২৬ হাজার নেতা-কর্মী হত্যার শিকার হয়েছিল। কুখ্যাত রাজাকার প্রধান মতিউর রহমান নিজামী, মুজাহিদের গাড়িতে পতাকা তুলে দিয়ে বেগম খালেদা জিয়া ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মাকে পদদলিত করেছে।

বিএনপির উদ্দেশ্যে তিনি আরো বলেন, আপনারা এমন অপকর্ম করেছেন, এমন রাজনীতি করেছেন আপনাদের নেতা হারিছ চৌধুরী মারা যাওয়ার পরে নিজের নাম দিয়ে দাফন হতে পারেননি। মাহমুদুর রহমান নাম দিয়ে গোপনে দাফন হতে হয়েছে। এসব আপনাদের অপকর্মের ফল।

হানিফ বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে মাদার অফ হিউম্যানিটি বা গণতন্ত্রের মা ডাকা হয়। বিশ্বের কোন পাগল আছে খালেদা জিয়াকে গণতন্ত্রের মা বলে? বিএনপির লজ্জা হওয়া উচিত। ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগের ২৬ হাজার নেতা-কর্মী হত্যা করে খালেদা জিয়ার হাত রক্তে রঞ্জিত। মানবতার মা তাকে বলা যেতে পারে না বরং তাকে হত্যাকারীর মা বলা যেতে পারে। বিএনপি নেতারা বলেন, খালেদা জিয়া প্রথম নারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বিএনপি নেতারা অতীতের কালো কাহিনী নতুন প্রজন্মের সামনে আনতে চায় কি-না সেটা জনগণ বুঝতে পারছে না। দেশের মানুষ জানে আমরা যখন যুদ্ধ করেছি বেগম খালেদা জিয়া ক্যান্টনমেন্ট কার মেহমানদারিতে ছিলেন।

দেশের যতকিছু অর্জন সব আওয়ামী লীগের হাত ধরে হয়েছে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে। আর দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। শত প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে তিনি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

স্মৃতিচারণ করে হানিফ বলেন, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশে দুঃশাসন চেপে বসেছিলো। ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার নিষিদ্ধ ছিলো, বঙ্গবন্ধুর নাম নিষিদ্ধ ছিলো। আওয়ামী লীগকে খণ্ড-বিখণ্ড করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে ধ্বংস করে দেয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছিলো। আওয়ামী লীগের লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হয়েছিলো। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের গুম করা হয়েছে করা হয়েছিল। বিনা বিচারে জেলখানায় রাখা হয়েছিলো। এই বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের তাবেদার রাষ্ট্র করার কাজ করেছিলেন বিএনপি নেতারা। অথচ আজ তারা বড় বড় কথা বলেন।

ছাত্রলীগের উদ্দেশ্যে হানিফ বলেন, শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে ছাত্রলীগের পদযাত্রা শুরু হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। তখনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন এই পাকিস্তান বাঙালি জাতির জন্য নয়। সেই কারণে শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের শাসন শোষণের প্রতিবাদ করেছিলেন। সে সময় বেশিরভাগ মানুষ ছিল অল্প শিক্ষিত। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য, ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধু প্রথম সমাজের জাগ্রত বিবেক হিসেবে বিবেচিত ছাত্রদের নিয়ে সংগঠন করেছিলেন। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সেই ছাত্রলীগ অনন্য ভূমিকা রেখেছিল।

হানিফ বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আত্মদান করেছিল ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। সম্মুখ যুদ্ধে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে জীবনবাজি রেখে বাঙালি মুক্তির জন্য লড়াই করেছিল এবং আত্মাহুতি দিয়েছিলে ছাত্রলীগের কর্মীরা। এদেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। কাজেই আমি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বলবো, এদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক জেনে, তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

তিনি বলেন, জাতির পিতা যখন দেশকে অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন সেসময়ে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, পশ্চিমা বিশ্বের সহায়তায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করেছিল। এ হত্যা ছিলো একাত্তরের পরাজয়ের চরম প্রতিশোধ। যারা এ হত্যাকান্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের বিচার হয়েছে কিন্তু যারা পেছন থেকে কাজ করেছে তাদের বিচার করা সম্ভব হয়নি।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জয় বাংলা শ্লোগানকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ৭ই মার্চের ভাষণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। আমি নিজেও ১৯৭৮ সালে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানোর কারণে বিএনপি নেতৃবৃন্দের হাতে আক্রমণের শিকার হয়েছিলাম।

আওয়ামী লীগের সিনিয়র এ নেতা বলেন, মির্জা ফখরুল বলেন তারাও নাকি মুক্তিযুদ্ধের দল। কোন বিবেকে আপনারা মুক্তিযুদ্ধের দল হিসেবে দাবি করেন? আপনার দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন কিন্তু উনি সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এমন কোন ইতিহাস আমরা পাইনি। আমরা যখন রণাঙ্গনে লড়াইয়ে ছিলাম তখন তিনি পাকিস্তানের কাছের ছিলেন ইতিহাসে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। সে সময়ে ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার আসলাম বেগ ক্যান্টনমেন্টে স্ত্রী-পুত্র ভালো আছে সেটা জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন এবং এটাও লিখেছিলেন আমরা তোমার কাজে খুশি তুমি এগিয়ে যাও। এ চিঠির মাধ্যমে প্রমাণিত হয় একাত্তরের জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন।

হানিফ বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, অর্থনৈতিক মুক্তি পেয়েছি জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। তারা উন্নয়ন চোখে দেখেন না। দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ থেকে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হয়েছি। তরুণসমাজ লোডশেডিং কি সেটা হয়তো ভুলে গেছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়েছে। করোনার কারণে সারাবিশ্বের মানুষ যখন বিপর্যস্ত, সেসময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সীমিত সম্পদ নিয়ে আমরা করোনা দুর্যোগ সফলভাবে মোকাবেলা করেছি। শেখ হাসিনার বিচক্ষণতার কারণে ক্ষতির পরিমাণ অন্য যেকোন রাষ্ট্রের তুলনায় অত্যন্ত কম হয়েছে।

গত ১৩ বছরে বাংলাদেশের সফলতা যে কোনো দেশের কাছে অবাক বিষয় উল্লেখ করে হানিফ বলেন, দেশে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে , কর্ণফুলী টানেল হচ্ছে, পায়রা সেতু হয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে। আজ আমরা স্যাটেলাইট ভুক্ত দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছি। বিভিন্ন সেক্টরের উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকতে বাংলাদেশকে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, লুটপাট ও মৌলবাদীদের চারণভূমি বানিয়েছিল, ব্যর্থ রাষ্ট্র প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল। তারা কথায় কথায় দেশের জন্য মায়াকান্না করছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদের সভাপতি অধ্যাপক জামাল উদ্দীন আহমেদ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মারুফা আক্তার পপি, প্রধানমন্ত্রীর অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার মুহাম্মদ আরিফুজ্জামান নূরনবী, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য। চারুকলা অনুষদ ছাত্রলীগের সভাপতি তন্ময় দেব নাথের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক ফাহিম ইসলামের লিমনের সঞ্চালনায় সম্মেলন উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন।