আগামী নির্বাচনের আগেই সবার জন্য পেনশন সুবিধা

সর্বজনীন পেনশন

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই সবার জন্য পেনশন সুবিধার কার্যক্রম শুরু করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে জুন মাসে ২০২২-২০২৩ প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে এ বিষয়ে একটি দিক নির্দেশনা দেবেন অর্থমন্ত্রী। আর সেখানে উল্লেখ থাকবে কবে নাগাদ এই পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হবে।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে সর্বজনীন পেনশনের বিষয়ে গুরুত্বরোপ করে এক থেকে দুই পৃষ্ঠা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বলে অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। ইতিমমধ্যে দেশে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে ‘জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে সরকার। ইতিমধ্যে সেটি ওয়েবসাইটে প্রকাশও করা হয়েছে। আগামী ১২ এপ্রিল পর্যন্ত খসড়া আইনটির বিষয়ে মতামত দেয়া যাবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র জানায়, সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এই পেনশন ব্যবস্থা দ্রুত চালু করার জন্য আমাদের কাছে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, জুনের মধ্যে খসড়াটি যেন চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হয়। খসড়া চূড়ান্ত করা হলে তা ভোটিং’র জন্য আইনমন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এর পর তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদে তোলা হবে। পরবর্তী চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এটি আবার সংসদে উত্থাপন করা হবে। সেখানে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ আইন অনুমোদন করা হবে।

এদিকে, আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে,
(ক) সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্তির পর একজন চাঁদাদাতা ধারাবাহিকভাবে কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা প্রদান সাপেক্ষে মাসিক পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে এবং চাঁদাদাতার বয়স ৬০ বছর পূর্তিতে পেনশন তহবিলে পুঞ্জিভূত মুনাফাসহ জমার বিপরীতে পেনশন প্রদান করা হবে।
(খ) প্রতিটি চাঁদাদাতার জন্য একটি পৃথক ও স্বতন্ত্র পেনশন হিসাব থাকবে, যা এ আইনের অধীনে প্রণীত বিধি দ্বারা পরিচালিত হবে।
(গ) চাকরিরত চাঁদাদাতারা চাকরি পরিবর্তন করলেও পূর্ববর্তী হিসাব নতুন কর্মস্থলের বিপরীতে স্থানান্তরিত হবে, নতুনভাবে হিসাব খোলার প্রয়োজন হবে না।
(ঘ) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মাসিক সর্বনিম্ন চাঁদার হার নির্ধারিত হবে। মাসিক ও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে চাঁদা প্রদান করা যাবে এবং অগ্রীম ও কিস্তিতে জমা প্রদানের সুযোগ থাকবে।

(ঙ) মাসিক চাঁদা প্রদানে বিলম্ব হলে বিলম্ব ফিসহ বকেয়া চাঁদা প্রদানের মাধ্যমে পেনশন হিসাব সচল রাখা যাবে এবং ওই বিলম্ব ফি চাঁদাদাতার নিজ হিসাবে জমা হবে।
(চ) পেনশনাররা আজীবন অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পেনশন সুবিধা ভোগ করবেন।
(ছ) পেনশনে থাকাকালীন ৭৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে মৃত্যুবরণ করলে পেনশনারের নমিনি অবশিষ্ট সময়কালের (মূল পেনশনারের বয়স ৭৫ বছর পর্যন্ত) জন্য মাসিক পেনশন প্রাপ্য হবেন।

(জ) কমপক্ষে ১০ বৎসর চাঁদা প্রদান করার পূর্বে চাঁদাদাতা মৃত্যুবরণ করলে জমাকৃত অর্থ মুনাফাসহ নমিনি-কে ফেরত দেয়া হবে
(ঝ) পেনশন তহবিলে জমাকৃত অর্থ কোন পর্যায়ে এককালীন উত্তোলনের সুযোগ থাকবে না।তবে চাঁদাদাতার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জমাকৃত অর্থের সর্ব্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ঋণ হিসাবে উত্তোলন করা যাবে যা ধার্যকৃত ফি সহ পরিশোধ করিতে হইবে। ফি সহ পরিশোধিত অর্থচাঁদাদাতার নিজ হিসাবেই জমা হইবে।
(ঞ) পেনশনের জন্য নির্ধারিত চাঁদা বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করে কর রেয়াতের জন্য বিবেচিত হইবে এবং মাসিক পেনশন বাবদ প্রাপ্ত অর্থ আয়কর মুক্ত থাকবে
(ট) সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতিতে সরকারি বা আধা-সরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করতে পারবে। এক্ষেত্রে কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের চাঁদার অংশ জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত হবে।
(ঠ) সরকার কর্তৃক সময় সময় প্রজ্ঞাপন জারী হওয়া সাপেক্ষে, নিম্ন আয়সীমার নিচের নাগরিকদের অথবা দুঃস্থ চাঁদাদাতার ক্ষেত্রে পেনশন তহবিলে মাসিক চাঁদার একটি অংশ সরকার অনুদান হিসেবে প্রদান করতে পারবে।

খসড়া আইন অনুযায়ী, এই আইন কার্যকরের পর সরকার যথাশীঘ্র সম্ভব আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, ‘জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করবে। কর্তৃপক্ষ একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হবে এবং এর স্থায়ী ধারাবাহিকতা ও সাধারণ সীলমোহর থাকবে এবং এই আইন বা তদধীন প্রণীত বিধি বা প্রবিধান সাপেক্ষে, কর্তৃপক্ষের স্থাবর বা অস্থাবর উভয় প্রকার সম্পত্তি অর্জন করবার, অধিকারে রাখবার বা হস্তান্তর করবার ক্ষমতা থাকবে এবং কর্তৃপক্ষ নিজ নাম ব্যবহার করে মামলা দায়ের করতে পারিবে এবং কর্তৃপক্ষের বিরূদ্ধেও মামলা দায়ের করা যাবে।

কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় হবে ঢাকায় এবং কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনবোধে, সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে, দেশের যে কোন স্থানে এর শাখা কার্যালয় স্থাপন করতে পারবে।খসড়ায় বলা হয়েছে, একজন নির্বাহী চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্য সমন্বয়ে কর্তৃপক্ষ গঠিত হবে। নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সদস্যরা সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হবেন এবং তাদের চাকরির মেয়াদ ও শর্ত সরকার কর্তৃক এ আইনের অধীন প্রণীত বিধি দ্বারা নির্ধারিত হইবে। তবে বিধি প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত গেজেটে আদেশ জারীর মাধ্যমে সরকার নির্ধারণ করতে পারবে। কর্তৃপক্ষসহ সর্বজনীনপেনশন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ব্যয় সরকার নির্বাহ করবে।

এছাড়াও আইনের উদ্দেশ্য পূরণে কর্তৃপক্ষ সরকারের অনুমোদনক্রমে নিজ নামে ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম বা এই স্কিমের আওতাধীন কোন কার্যক্রম, স্কিম বা প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কর্মচারী এই আইনের কোনো ধারা বা এর অধীনে প্রণীত কোনো বিধি বা প্রবিধানের কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে আদালতের মাধ্যমে ওই ব্যক্তি বা কর্মচারীর এক বা একাধিক ব্যাংক হিসাব ক্রোক করতে পারবে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অধীনে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি পেনশন ‘গভর্নিং বোর্ড’ থাকবে। এর চেয়ারম্যান হবেন অর্থমন্ত্রী এবং সদস্য সচিব হবেন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান। গভর্নিং বোর্ড বৎসরে ন্যূনতম চারটি সভা করবে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, আইনের অধীনে ‘জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ তহবিল’ নামে কর্তৃপক্ষের একটি তহবিল থাকবে এবং এ তহবিলের উৎস হবে (ক) সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান; (খ) আইনের অধীন আদায়যোগ্য ফি ও চার্জ; (গ) কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত সেবা বাবদ প্রাপ্ত অর্থ; (ঘ) সরকারের পূর্ব-অনুমোদনক্রমে গৃহীত ঋণ এবং (ঙ) অন্য কোন উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থ।তহবিলের অর্থ কর্তৃপক্ষের নামে কোন তফসিলি ব্যাংকে জমা রাখা হবে এবং কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতিতে এ তহবিল থেকে অর্থ উঠানো যাবে। এ তহবিলের অর্থ থেকে কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান, সদস্য এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পারিশ্রমিক, সম্মানী ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করা হবে।

এছাড়া একটি ‘সর্বজনীন পেনশন তহবিল’ গঠনের কথা উল্লেখ করে খসড়ায় বলা হয়েছে, পেনশন বাবদ জমাকৃত অর্থ সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ‘সর্বজনীন পেনশন তহবিল’ গঠন করা হবে। সর্বজনীন পেনশন তহবিলে চাঁদাদাতার চাঁদা জমা, জমার হিসাব সংরক্ষণ, পুঞ্জিভূত অর্থের সুষ্ঠু ও নিরাপদ বিনিয়োগ এবং পেনশন প্রদানসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রম সম্পাদন করা হবে। এ তহবিলে অর্থের উৎস হবে (অ) পেনশন ব্যবস্থায় নিবন্ধিত চাঁদাদাতার চাঁদা; (আ) প্রতিষ্ঠানসমূহের অংশগ্রহণমূলক চাঁদা; (ই) বিনিয়োগকৃত অর্থের পুঞ্জিভূত মুনাফা; (ঈ) নিম্ন আয়ের বা দুঃস্থ চাঁদাদাতাদের জন্য সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান; এবং (উ) অন্যান্য সূত্র থেকে আয় ইত্যাদি।